1. info@dailyshadhinbarta.com.bd : sbarta : দৈনিক স্বাধীন বার্তা Shadhin Barta
বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন

কিংবদন্তী বাউল সাধক আব্দুল মজিদ তালুকদারকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এর প্রস্তাবনা

ইকবাল কবির, জেলা (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি:
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫

বাংলার লোকসংগীতের এক অমর সাধক, গীতিকবি ও সুরকার আব্দুল মজিদ তালুকদারকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করার জোর দাবি উঠেছে। লোকসংস্কৃতির সেবায় ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননার জন্য তাঁর পরিবার ও গুণগ্রাহীরা দীর্ঘদিন ধরে আবেদন জানাচ্ছে।

সর্বশেষ, গত ৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তাঁর সুযোগ্য পুত্র, বাউল শিল্পী আবুল বাশার তালুকদার, নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইমদাদুল হক তালুকদারের মাধ্যমে এই আবেদনটি পুনরায় জমা দিয়েছেন।

এক বিপ্লবী কণ্ঠস্বরের জীবনকথা নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার দলপা ইউনিয়নের ইটাউতা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জানুয়ারি (১৩০৫ বঙ্গাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তী বাউল সাধক। তাঁর পিতা ছিলেন হাজী মো: আমছর তালুকদার এবং মাতা মোছা: মগলের মা।

কৈশোরে মাদ্রাসা ও পরবর্তীতে নেত্রকোনা চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাশ করেন তিনি। কৈশোরে তাঁর দেওয়া আযান শুনে মুগ্ধ হয়ে মাদ্রাসার প্রধান একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “ও যদি গান গাইত তবে সারাজীবন গানের ভুবনে অমর হয়ে থাকত।” আবহমান কালের স্রোতে সেই অমর বাণীই আব্দুল মজিদ তালুকদারের মরমে গেঁথে প্রেরণার উৎস হয়ে প্রতিফলিত হয় তাঁর সমগ্র সঙ্গীত জীবনে।

মরমী কবি জালাল উদ্দিন খাঁ’র বাড়িতে নিয়মিত গানের আসরে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। প্রথম জীবনে তিনি লেঠুর দলে রাধা-কৃষ্ণের অভিনয় ও গান দিয়ে গানের যাত্রা শুরু করেন এবং উদাসী ভাবের জন্ম নেন।

সংগ্রামের হাতিয়ার ছিল তাঁর গান আব্দুল মজিদ তালুকদার কেবল একজন শিল্পীই ছিলেন না; তিনি গানকে করেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গণ-আন্দোলনের হাতিয়ার।

তিনি তাঁর মরমি সাধনার মাধ্যমে লোকগীতি, ভাটিয়ালি, পল্লিগীতি, জারি-সারি ও বাউল গানের সকল শাখাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র, শিল্পী আবুল বাশার তালুকদার সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন, আব্দুল মজিদ তালুকদার ছিলেন লেখক, কবি, গীতিকবি ও সংগ্রাহক। তিনি ১৯৩৩ সাল থেকে পূর্ব বাংলার নথিপত্রে পাওয়া প্রথম সারির শিল্পী-কবিদের মধ্যে একজন।

​শিল্পীর নথিপত্রে যা প্রমাণিত: সংগ্রামের গান: ১৯৪৫ সালে সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনে তাঁর রচিত “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই” গানটি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। প্রতিষ্ঠিত শিল্পী: তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে শুরু করে পাকিস্তান বেতার-টেলিভিশন, গ্রামোফোন এবং বাংলাদেশ বেতার-টেলিভিশন-এর জন্মলগ্ন থেকেই গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রথম সারিতে কাজ করেছেন।

বিশাল ভান্ডার: তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানের সংখ্যা সাড়ে ছয় শতাধিক, যা ‘মজিদগীতি সমগ্র’-এ সংরক্ষিত।
​আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়োৎসবে গান গেয়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেছিলেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক মানের শিল্পসত্তার প্রমাণ।

মরণোত্তর একুশে পদক-এর দাবি কেন? তাঁর পরিবার ও গুণগ্রাহীরা আক্ষেপ করে বলছেন, এই মহান সাধকের প্রয়াণের পর ১৯৮৮ সালের ২৯ জুন এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও, তাঁর অসামান্য কাজের যথার্থ রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন হয়নি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাঁর গান ছিল শাণিত প্রতিবাদ।

শিল্পী আবুল বাশার তালুকদার বলেন, “তাঁর সকল ডকুমেন্টস থাকা সত্ত্বেও আমরা বারবার আবেদন করছি। এবার নিয়ে কতবার আবেদন করেছি, তা আর গুনে বলতে পারছি না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন “আমরা চাই, দেরিতে হলেও সরকার তাঁর মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ প্রদানের মাধ্যমে নেত্রকোনার এই বাউল সাধকের প্রতি ন্যায়বিচার করুক।”

সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষজন আশা করছেন, এবারের আবেদনটি বিবেচনা করা হবে এবং বাংলার লোকসংস্কৃতির এই মহান সেবককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান প্রদান করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
LICENCE NO- TRAD/DSCC/210965/2019 and applied for registration.
Community Verified icon