1. info@dailyshadhinbarta.com.bd : sbarta : দৈনিক স্বাধীন বার্তা Shadhin Barta
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০২:২৪ পূর্বাহ্ন

বিয়ে কেন?

এস এম আজাদ রহমান, লেখক ও কলামিস্ট
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

মানুষের জীবনের সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি—বিয়ে কেন?

এই প্রশ্নের উত্তরে আগের প্রজন্মের মানুষ সাধারণত দুটি কারণের কথা বলতেন। প্রথমত, জীবনের শেষ বয়সে একজন সঙ্গী প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, অসুস্থতা বা দুর্বলতার সময় পাশে থাকার মতো একজন মানুষ দরকার।

কথাগুলো ভুল নয়। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, এই যুক্তিগুলোর ভেতরে এক ধরনের ভয় কাজ করে—নিঃসঙ্গতার ভয়, অসহায় হয়ে পড়ার ভয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভয়। যেন বিয়ে ভালোবাসার চেয়ে বেশি, জীবনের অনিশ্চিত পথের জন্য একটি নিরাপত্তা-ব্যবস্থা।

কিন্তু যদি কেবল বার্ধক্যে পাশে কাউকে পাওয়াই উদ্দেশ্য হয়, তবে অর্থের বিনিময়ে একজন পরিচর্যাকারীও রাখা যায়। তিনি ওষুধ দেবেন, খোঁজ নেবেন, প্রয়োজনে গল্প করবেন। তাহলে কি বিয়ের মূল উদ্দেশ্য কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা?

আবার অনেকেই বলেন, বিয়ে মানে দু’জন মানুষের একসঙ্গে পথ চলা। একসঙ্গে ভ্রমণ, গল্প, হাসি, সিনেমা, খাবার, স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং অন্তরঙ্গতার ভাগাভাগি। শুনতে সুন্দর, অনুভব করতেও সুন্দর।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভালোবাসার জন্য কি বিয়ে অপরিহার্য?

প্রেম মানুষের সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিগুলোর একটি। তার জন্ম হয় স্বাধীনতায়, আকর্ষণে, বিস্ময়ে এবং আবিষ্কারের আনন্দে। প্রেমের সৌন্দর্য তার স্বেচ্ছায় আসা-যাওয়ায়। অথচ বিয়ে অনেক সময় সেই স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিকে দায়িত্ব, অভ্যাস, হিসাব-নিকাশ এবং সামাজিক প্রত্যাশার কাঠামোর মধ্যে বেঁধে ফেলে।

যে সম্পর্ক একদিন ছিল মুক্ত বাতাসের মতো, সেটিই ধীরে ধীরে দৈনন্দিনতার ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে।

আমি যদি সত্যিই কারও ব্যক্তিত্বে, মমতায়, চিন্তায় কিংবা হাসিতে মুগ্ধ হই, তাহলে কেন সেই মুগ্ধতার স্বাভাবিক পরিণতি হবে একটি আজীবন আইনি ও সামাজিক চুক্তি? কেন আমাকে তার প্রতিটি অভ্যাস, প্রতিটি দুর্বলতা, প্রতিটি ক্লান্তি এবং জীবনের প্রতিটি বাস্তবতার সঙ্গে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ হয়ে যেতে হবে?

কেন দুটি স্বাধীন মানুষের ভালোবাসার মাঝখানে একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোকেই একমাত্র বৈধ গন্তব্য হিসেবে ভাবা হবে?

রবীন্দ্রনাথের একটি উপমা মনে পড়ে। সকালের দীপক রাগিণীর ওপর যদি বাসন মাজার জল ঢেলে দেওয়া হয়, তবে কি তার সুর আগের মতো থাকে?

প্রেমও অনেকটা তেমন। অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা, অনিবার্যতা এবং মালিকানাবোধের চাপে তার সহজ সৌন্দর্য অনেক সময় ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রেম বদলে যায়। তার জায়গায় আসে অভ্যাস, নির্ভরতা, দায়িত্ব, মায়া এবং সহাবস্থান। দীর্ঘদিন পাশাপাশি চলতে চলতে আমরা প্রায়ই এই মায়াকেই প্রেম বলে মনে করি। অথচ প্রেমের প্রথম বিস্ময়, প্রথম আলোড়ন, প্রথম উজ্জ্বলতা হয়তো অনেক আগেই অন্য রূপ ধারণ করেছে।

হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে বড় শত্রু ঘৃণা নয়—বাধ্যবাধকতা।

কারণ ভালোবাসা কখনও আদেশ মানে না। তাকে বলা যায় না—“তোমাকে সারাজীবন এই একজনকেই ভালোবাসতে হবে।”

মানুষের হৃদয় কোনো আইন, কোনো সংবিধান, কোনো সামাজিক চুক্তির কাছে সম্পূর্ণ অনুগত নয়। সে কখন, কাকে, কতদিন ভালোবাসবে—তার কোনো নিশ্চিত সমীকরণ নেই।

কোনো ভালোবাসা হয়তো এক ঋতু বাঁচে, কোনোটি এক দশক, কোনোটি সারাজীবন। আবার কোনো সম্পর্ক খুব অল্প সময়েই তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে। তখন যদি কেবল সামাজিক চাপ বা ভয়ের কারণে সেই মৃত সম্পর্ককে টেনে নিয়ে যেতে হয়, তবে তা ধীরে ধীরে দু’জন মানুষকেই ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়।

এরপর আসে সংসারের বাস্তবতা।

অর্থনৈতিক চাপ, কর্মজীবনের ক্লান্তি, সন্তানের দায়িত্ব, প্রতিদিনের পুনরাবৃত্তি—সব মিলিয়ে আবেগের জন্য বরাদ্দ জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। যে মানুষটির দিকে একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকা যেত, তাকেই একদিন খুব পরিচিত, খুব স্বাভাবিক, খুব নিত্যদিনের বলে মনে হয়।

এর সঙ্গে যদি যোগ হয় অপূর্ণতা, অবহেলা, না-বলা কষ্ট কিংবা অন্তরঙ্গতার একঘেয়েমি, তবে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। অথচ সমাজ প্রায়ই বলে—“যা-ই হোক, সম্পর্ক ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাববে না।”

সেখানেই মূল প্রশ্নটি ফিরে আসে—

ভালোবাসা কি স্বাধীনতার আরেক নাম, নাকি বাধ্যবাধকতার?

তবে এর অর্থ এই নয় যে সব বিয়ে ব্যর্থ, কিংবা সব প্রেম বিয়ের পর হারিয়ে যায়। পৃথিবীতে অসংখ্য দাম্পত্য রয়েছে, যেখানে বন্ধুত্ব, সম্মান, যত্ন, আকর্ষণ এবং ভালোবাসা একসঙ্গে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। আবার এমনও বহু সম্পর্ক আছে, যেখানে একই ছাদের নিচে থেকেও দু’জন মানুষ ভীষণ একা।

তাই প্রশ্নটা বিয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়।

প্রশ্নটা হলো—আমরা কেন বিয়ে করছি?

ভয় থেকে? সামাজিক চাপে? একাকীত্বের আতঙ্কে?

নাকি এমন একজন মানুষের সঙ্গে জীবন ভাগ করে নেওয়ার আনন্দে, যার স্বাধীনতাকে সম্মান করেও তাকে ভালোবাসা যায়?

হয়তো বিয়ে তখনই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন তা ভালোবাসাকে বন্দী করে না; বরং তাকে আরও নিরাপদ, আরও মর্যাদাপূর্ণ এবং আরও বিস্তৃত হতে সাহায্য করে।

কারণ প্রকৃত ভালোবাসা মালিকানা নয়, নিয়ন্ত্রণ নয়, বন্দিত্বও নয়।

ভালোবাসা হলো এমন এক আশ্রয়, যেখানে দু’জন মানুষ পাশাপাশি হাঁটে, একে অপরকে ধারণ করে, কিন্তু কেউ কারও স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না।

হয়তো সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞাটিও এটিই—একসঙ্গে থাকা, কিন্তু একে অপরের মালিক হয়ে নয়; বরং একে অপরের পাশে থেকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
LICENCE NO- TRAD/DSCC/210965/2019 and applied for registration.
Community Verified icon