মৌলভীবাজারের এক নিভৃত কোণে লেখা হলো মানবতার নতুন ইতিহাস। এক এতিম যুবকের প্রাণ বাঁচাতে স্বার্থহীন ভালোবাসা আর নিঃস্বার্থতা দেখালেন একদল মানুষ। রক্তস্বল্পতায় মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা ওই যুবকের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি মুহূর্ত যেন মনে করিয়ে দিল— “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।”
রক্তের খোঁজে এক যুদ্ধ:
শাহ মোস্তফা রোডের মালাজা টাওয়ার মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২২ বছরের এক এতিম যুবক। হিমোগ্লোবিন ৬ পয়েন্টে নামায় তার মুখে শ্বাস, চোখে মৃত্যুর ভয়। চিকিৎসকরা জানালেন, জরুরি রক্ত ট্রান্সফিউশন ছাড়া বাঁচার আশা ক্ষীণ। সমস্যা হলো, তার রক্তের গ্রুপ B নেগেটিভ—বিরল, যা খুঁজে পাওয়া যেন সাগরে সূচ খোঁজা!
যখন হাসপাতাল এগিয়ে এলো মায়ের মতো:
সংকটের সেই মুহূর্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করলেন— “রোগীর চিকিৎসার সব খরচ আমরা বহন করব।” শুধু অর্থ নয়, স্টাফদের দৌড়ঝাঁপ, ডাক্তারদের রাতজাগা পরিশ্রম, আর সেবিকার মমতাময়ী স্পর্শে যেন ফিরে এলো জীবনের আশা। হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মো: শাহিন আহমেদ ও এমডি কল্যাণ বৈদ্যর নেতৃত্বে টিমটি কাজ করলো অক্লান্তভাবে।
মইনুদ্দীন: এক বীরের গল্প:
রক্তের খোঁজে যখন সবাই হতাশ, ঠিক তখনই এগিয়ে এলেন স্থানীয় যুবক মইনুদ্দীন। জানতেন, আগামী মাসে তাঁর নিজের অপারেশন। তবুও বললেন, “আমার অপারেশন পিছিয়ে যাক, আজ এই ভাইয়ের জীবন বাঁচাই জরুরি।” তাঁর বুক ভরা ভালোবাসা আর ত্যাগের রক্তে শুধু এতিমের প্রাণই ফিরল না—জ্বলে উঠল মানবতার দীপশিখা।
আর্তের সেবায় যেন মায়ের আদর:
হাসপাতালের করিডোরে রোগীর শয্যাপাশে ডাক্তার, নার্স, এমনকি সাধারণ কর্মচারীরাও হয়ে উঠলেন পরিবারের সদস্য। খাবারের ব্যবস্থা থেকে মানসিক সমর্থন—সবই যেন নিশ্চিত করলো প্রতিষ্ঠানটি। এক সেবিকা বলেন, “ও আমাদের সবার ছেলে। এতিম বলে নয়, মানুষ বলে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি।”
সমাজের জন্য বার্তা:
এই ঘটনা শুধু একটি চিকিৎসার গল্প নয়, এ হলো সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে প্রশ্ন— “আমরা কতটুকু দিতে প্রস্তুত?” মইনুদ্দীন ও হাসপাতাল কর্মীদের দেখানো পথে আজ মৌলভীবাজারের মানুষ গর্বিত। স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগমের চোখে জল, “এমন গল্প শুনলে বিশ্বাস ফিরে আসে—আজও মানুষ মরে নি!”
যেখানে শেষ হয় না গল্প:
যুবকটি এখন সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু তাঁর চোখে-চোখে মইনুদ্দীন ভাই আর সাদা এপ্রোনে ডাক্তারদের প্রতি শ্রদ্ধা। এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র যেন বলে— “মানবতা কখনো মরেনি, শুধু প্রয়োজন একটু আলো ছড়ানোর সাহস।”
মৌলভীবাজার মা ও শিশু হাসপাতালের এই মহৎ উদ্যোগ ও মইনুদ্দীন ভাইয়ের আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীটা তখনই সুন্দর যখন আমরা নিজের চেয়ে অন্যের ব্যথাকে বড় করে দেখি।