বগুড়ার শাজাহানপুরে আট বছরের শিশু রিফাত হোসেনকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ ও হত্যার পর লাশ গুমের মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে অপরাধের সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকায় পাঁচ কিশোরকে ১০ বছর করে আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ রোববার (২১ জুন) দুপুরে বগুড়ার প্রথম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আনোয়ারুল হক এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন:
শাজাহানপুর উপজেলার খাদাস ভোলাগাড়ী গ্রামের আবুল কালাম আজাদ, খাদাস ভাবুকনারপাড়ার সেলিম ইসলাম, খাদাস তালুকদারপাড়ার মেহেদী হাসান, খাদাস মাঠপাড়ার রাজু মিয়া ওরফে পাঁচফুল এবং খাদাস ভোলাগাড়ীর মো. সাগর মিয়া। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে সাগর ও সেলিম দীর্ঘদিন ধরে পলাতক রয়েছেন।
আটকাদেশ পাওয়া ৫ কিশোর হলো:
খদাস গ্রামের সজিব হাসান, মফিজুল ইসলাম, জাহিদ হাসান, বোরহান আলী ও বায়েজিদ হেসেন। অপরাধ সংঘটনের সময় তারা অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকায় শিশু আইনে তাদের এই সাজা দেওয়া হয়।
মামলার বিবরণ ও পটভূমি:
আদালত ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহত রিফাত হোসেন উপজেলার খাদাস হাটখোলা গ্রামের প্রবাস ফেরত এনামুল হকের ছেলে। আসামিরা সবাই তাদের প্রতিবেশী ও পরিচিত। আসামি আবুল কালাম আজাদ প্রায়ই এনামুলের কাছে টাকা দাবি করতেন। ঘটনার দিনও তিনি এক লাখ টাকা দাবি করলে এনামুল তা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই রাতে দোকান থেকে বাড়ি ফেরার পথে শিশু রিফাতকে অপহরণ করা হয়। এরপর রিফাতের পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে আসামিরা। অপহরণের তিনদিন পর, ১৮ জুলাই সকালে উপজেলার পোয়ালগাছা গ্রামের সিংহবাড়ি সেতুর নিচে কচুরিপানার মধ্য থেকে রিফাতের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এই ঘটনায় রিফাতের বাবা এনামুল হক বাদী হয়ে শাজাহানপুর থানায় ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। এর মধ্যে মাসুদ রানা নামে এক আসামি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বাকি ১০ আসামির মধ্যে ৯ জনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল।
বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া:
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নিহত শিশুর বাবা ও মামলার বাদী এনামুল হক বলেন, “আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, উচ্চ আদালতেও যেন এই রায় বহাল রাখা হয় এবং দ্রুত সাজা কার্যকর করা হয়। ফাঁসি দ্রুত কার্যকর হলে আর কোনো অপরাধী এভাবে কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি করার সাহস পাবে না।”
ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আলী আসগার রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা এই রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।” আদালত পলাতক দুই আসামির বিরুদ্ধে সাজা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন এবং আগামী ৭ দিনের মধ্যে আসামিদের আপিল করার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।