পুলিশে চাকরি দেওয়ার নামে অভিনব কায়দায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া গোপালগঞ্জের আলোচিত প্রতারক ‘আকবর পাঠান’ ওরফে এনামুল হক আকবর ও তাঁর সহযোগী শাফায়েত হোসেন অবশেষে সিআইডির খাঁচায় বন্দি হয়েছেন।
গত মঙ্গলবার ১৭ জুন রাজধানীর রাজারবাগ এলাকায় চাকরিপ্রার্থীদের ভুয়া স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফাঁদ পেতে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার সময় হাতেনাতে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি। গ্রেফতারকৃত মূল হোতা আকবর পাঠান গোপালগঞ্জের পারচন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামের মৃত সিরাজ মোল্যার ছেলে।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, চাকরিপ্রার্থীদের বিশ্বাস অর্জন করতে এই চক্রটি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অগ্রিম স্বাক্ষরযুক্ত চেক জামানত হিসেবে দিত। এরপর রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে ভুয়া মেডিকেল পরীক্ষার নাটক সাজিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত। আটকের সময় তাদের কাছ থেকে নগদ সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং প্রতারণায় ব্যবহৃত স্বাক্ষরযুক্ত চেকবই উদ্ধার করা হয়।
এদিকে আকবর পাঠান গ্রেফতারের পর সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজনৈতিক দাপট, ক্যাসিনো আসক্তি ও নানাবিধ জালিয়াতির ভয়ঙ্কর সব তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতাদের সরাসরি প্রচ্ছায়ায় থেকে চাকরি দেওয়ার নামে একচ্ছত্র প্রতারণা সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন এই আকবর পাঠান। তিনি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন ধলপুর এলাকায় যুবলীগের রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কার্যালয়ে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল এবং তিনি নিয়মিত ক্যাসিনো বা জুয়ার আসরে যেতেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে একাধিক সুনির্দিষ্ট প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানী তথ্যে আরও জানা যায়, গত ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে দৈনিক স্বাধীন বার্তা অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ তরিকুল ইসলামের মাতুয়াইল মেডিকেল সংলগ্ন দারুচিনি টাওয়ারে অবস্থিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘তারেক ইলেকট্রনিক্স’-এ চড়াও হন আকবর পাঠান। সেখানে তিনি ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন, যার আগেও তিনি বেশ কয়েকবার এসে চাঁদা দাবি করেছিলেন।
ঘটনার দিন চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রেখে ১২ থেকে ১৫ জনের একটি ক্যাডার বাহিনী নিয়ে মব জাস্টিসের নামে সাংবাদিক তরিকুল ইসলামের ওপর বর্বর ও অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলায় গুরুতর জখম হয়ে ওই রাতেই তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং পরবর্তীতে কদমতলী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
এ বিষয়ে কদমতলী থানার উপ-পরিদর্শক বেলাল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মাতুয়াইলে অবস্থিত তারেক ইলেকট্রনিক্স-এর স্বত্বাধিকারী মোঃ তরিকুল ইসলাম তারেকের ওপরে অতর্কিত হামলার ঘটনাটি সম্পূর্ণ সত্য। মোঃ তরিকুল ইসলামকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সামনে আটকে রেখে মারধরের স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের সংরক্ষণে রয়েছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঘটনার সময়ে অপরাধীদের সঠিক নাম-ঠিকানা না থাকায় তখন তাদের তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অন্য একটি বড় জালিয়াতির মামলায় প্রধান অপরাধী আকবর পাঠান সিআইডির হাতে গ্রেফতার হওয়ায়, এখন ভুক্তভোগী মোঃ তরিকুল ইসলামকে সব ধরনের আইনি সহযোগিতা প্রদান করা হবে। একই সাথে সিসিটিভি ফুটেজ নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করে এই পাশবিক হামলার সাথে জড়িত বাকি আসামিদেরও দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আকবর পাঠানের এই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসার পর ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং তারা এই প্রতারক চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।