বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান নিয়ে দেওয়া মন্তব্যে গভীর উদ্বেগ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনা সভায় মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের এই বক্তব্য শুধু অসঙ্গতই নয়, বরং ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। তিনি এতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জুবায়ের আরও উল্লেখ করেন, ‘ইনকিলাব’ শব্দটি আরবি উৎসের হলেও উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম এবং গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ভাষা কোনো সংকীর্ণ সীমানায় আবদ্ধ নয়—জনগণের ব্যবহারে তা সমৃদ্ধ ও বিকশিত হয়।
তিনি বলেন, বাংলা ভাষা নিজেই তদ্ভব, তৎসম, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ, ইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে আজকের রূপ লাভ করেছে। কোনো শব্দের উৎপত্তি দেখে তাকে ‘বাংলাবিরোধী’ বলা ভাষাবিজ্ঞানের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। ভাষার নামে বিভাজন সৃষ্টি করে জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করার চেষ্টা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে কাম্য নয়।
‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া স্লোগান নয়—এটি শোষণ, অন্যায় ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। দেশের ছাত্র-জনতা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন তাদের কণ্ঠরোধের জন্য ভাষাগত যুক্তি দাঁড় করানো গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। জুবায়ের আরও বলেন, মন্ত্রী দাবি করেছেন যে এ স্লোগান শুনলে তার ‘রক্তক্ষরণ’ হয়। অথচ জনগণের অধিকার হরণ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, ঘুষ-দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অনিয়ম এবং বৈষম্যের মতো সমস্যাগুলো দেশে চরম আকার ধারণ করেছে—এসব তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায় না। প্রকৃতপক্ষে এগুলোই জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট, কিন্তু মন্ত্রীর মতো ব্যক্তিদের হৃদয়ে এসব পৌঁছায় না।
দেশবাসীর প্রত্যাশা, জনগণের ন্যায্য প্রতিবাদের ভাষাকে দোষারোপ না করে জনদুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই সরকারের দায়িত্ব। জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে, বাংলা ভাষা আমাদের গৌরব ও আত্মপরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। এতে বহুমাত্রিক শব্দভাণ্ডার ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় রয়েছে। কোনো শব্দ বা স্লোগানকে কেন্দ্র করে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা পরিহার করতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে দলটি অবিলম্বে মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় জনগণই এর যথাযথ জবাব দেবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে শেষে বলা হয়েছে, আল্লাহ আমাদের দেশ ও জাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করুন।
প্রসঙ্গত, শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সিরাজগঞ্জে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনা সভায় মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছিলেন, বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে ধারণ করতে হলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। এ স্লোগান বাংলার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল তাদের ভাষা। এমন মন্তব্যে তার ‘রক্তক্ষরণ’ হয় বলেও উল্লেখ করেন।